শেরপুরের কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল ওয়াহাব এর মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিচারণ

by শেরপুর কণ্ঠ ডেস্ক
6 মিনিটের পড়া

ষ্টাফ রিপোর্টার : ১৯৭১ সাল তখন আমার বয়স ১৯ কিংবা ২০ বছর হবে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কারণে দেশে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিল। চারদিকে মারামারি কাটাকাটি। দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে কি করবো কোথায় যাবো বুঝতে পারছিলাম না। এমতাবস্থায় একটি ছেলে আমার কাছে রেডিও নিয়ে আসলো আর বলল যে রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধারা কথা বলবে আসেন আমরা শুনি। তখন রেডিওর ভলিউম বাড়ানো যায় না উচ্চস্বরে কথাই বলা যায় না । তখন চুপি চুপি দুই তিন জন একসাথে হয়ে কম ভলিউম দিয়ে আমরা রেডিওর খবর শুনতাম। তখন চরমপত্রে ঐ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধার এতগুলো সৈনিক মারা গেছে , ঐ এলাকায় পাক বাহিনীর এতগুলো সৈনিক মারা গেছে। এরকম খবর শুনছিলাম । এরকম খবরের মাঝখানে মেজর জিয়াউর রহমান নামে একজন লোক ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতেছে। আমি আমার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম কি কথাটা বলল ভালো করে বুঝলাম না তখন আমার ভাই আমাকে বুঝিয়ে দিল উনি মেজর জিয়াউর রহমান উনি স্বাধীনতার ঘোষণা করছে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে। তার স্বাধীনতা ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য আমরা নন্নী বারোমারি মিশন এর পূর্ব পাশ দিয়ে ঢালুতে যাই। ভারতের সাব সেক্টর ঢালু তে গিয়ে আমরা নাম লেখাই। ঢালুর দায়িত্বে ছিলেন আমাদের বাংলাদেশের ময়মনসিংহের মতিউর রহমান প্রিন্সিপাল। উনি নাম লিখে আমাদেরকে ভর্তি করে এবং মাসাং পানি নামে ভারতের জায়গা আছে যে জায়গায় যুদ্ধের সময় ইন্দিরা গান্ধী হেলিকপ্টারে আসছিল। ওইখানে শরণার্থী ক্যাম্পের পাশে আমাদেরকে জায়গা দিল। আমরা সেখানে অস্ত্রবিহীন ট্রেনিং করলাম। অস্ত্র দিচ্ছে না প্রায় মাস হয়ে গেল তখন আমরা ১৫/২০ জন মিলে অস্ত্র চাই,গুলি চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই,পচে মরার জন্য ভারতে আসি নাই। এমন স্লোগান দিয়ে মতিউর রহমান এবং ডাক্তার হামিদুল্লাহ মেজর এর কাছে গেলাম তারা বললেন আপনারা কার সাথে ঝগড়া করতেছেন। এখানে কি আমাদের সরকার আছে আমরা অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি এখানে কোন সংগ্রাম চলবে না তোমাদেরকে যেখানে জায়গা দেওয়া হয়েছে সেখানেই যাও যেয়ে চুপ করে বসে থাকো। যখন গাড়ি আসবে তখন আমরা বলে দিব তোমরা ট্রেনিংয়ে যাবা। পরে আমরা চলে যাই। সারাদিনে কষ্ট করে একবারে এক চামচ জাও খেয়ে সারাদিন কাটাইতে হইছে। একটা প্লেট নাই কেউ গামছায় কেউ রুমালে কেউ কাগজের ভিতরে কেউ পাতার ভিতরে জাওটা নিয়ে কোনভাবে খেয়ে জীবন বাঁচাইতাম। পরে ওখান থেকে হঠাৎ একদিন আমাদেরকে বললো যে তোমরা রেডি হয়ে যাও তোমাদেরকে ট্রেনিংয়ে যাইতে হবে সুবেদার হাকিম সাহেবের নেতৃত্বে ট্রেনিং করবা। কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার হাকিম সাহেব ইপিআর এ সুবেদার ছিলেন। বর্ডারেই ছিলেন উনি। আমরা উনার সাথে তুরাতে চলে যাই। সেখানে আমরা অস্ত্রসহ একমাস ট্রেনিং করার পর সুবেদার হাকিম সাহেবের সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়া হয় মহেন্দ্রগঞ্জ নামে ভারতের একটা জায়গার । এক পাশে মহেন্দ্রগঞ্জ আরেকপাশে বাংলাদেশের ধানুয়া কামালপুর। মহেন্দ্রগঞ্জ একটা ক্যাম্প করা হয়। সেখান থেকে আমরা কামালপুর সহ ঘুঘুমারি,কুদালকাটি,খদ্রু বাশ পাতা চিলমারীর খোজ খবর নেই। খোঁজ খবর নিয়ে তারপর আমাদেরকে পাঠানো হয় ঘুঘুমারি। ঘুঘুৃমারি একটা ক্যাম্প করা হয়। ঘুঘুমারি ক্যাম্প থেকে আমরা চিলমারী আক্রমণ করি। চিলমারী আক্রমণের সময় আব্দুল জলিল নামে একজন সিপাহী শহীদ হন। আহত সিপাহী আব্দুল জলিল কে নিয়ে যখন আমরা যমুনা নদীর মাঝামাঝি আসি তখন তিনি মৃত্যুবরন করেন। তাকে আমরা ঘুঘুমারি চড়ে দাফন করি। পরে আমরা ঐ এলাকার মানুষকে জানিয়ে দেই যে জলিল নামে একজন শহীদ হয়েছেন আজ থেকে এই এলাকার নাম জলিল নগর। সেখান থেকে আমরা চলে আসি খদ্রু বাঁশপাতা রৌমারী। সেখান আমরা অবস্থান নেই। সেখানে পাকিস্তানি বিমান হামলা হয়। সেখান থেকে আমরা চলে যাই রৌমারী। রৌমারী ক্যাম্প করি। সেখান থেকে আমরা গিয়ে রংপুর জেলার বিভিন্ন জায়গায় রেললাইন এর পাশে অবস্থান নেই। চৌধুরানী নামে একটা স্টেশন আছে সেখানে পাকবাহিনী আমাদের না পেয়ে বম্বিং করে স্টেশনটা ভেঙে দিয়ে চলে যায়। আমরা আবার চলে আসি রৌমারি হেডকোয়ার্টার। তারপর একদিন হঠাৎ করে রাস্তায় আমার আপন ভাই আব্দুল গফুর তার সাথে দেখা। সে শুনছে আমি মারা গেছি। হঠাৎ আমি যখন তার সামনে দাড়াইয়া দেখতাছি আমার ভাইয়ের মতো দেখা যায়। আমার ভাই দৌড়াইয়া আইসা আমাকে পাঞ্জা দিয়ে ধইরা কান্নাকাটি শুরু করে। আমার ভাই বলল তুই নাকি মারা গেছোস। আমি বললাম আমি মারা যাই নাই অনেকেই মারা গেছে আমি বাইচা আছি । দুই ভাই অনেক কান্নাকাটি করি। তারপর ইয়ুথ ক্যাম্পে যাই এবং মেজর জিয়ার সঙ্গে দেখা করি। আমি মেজর জিয়াকে চিনতাম না। আমার ভাইয়ের মাধ্যমে মেজর জিয়াকে চিনতে ও দেখতে পাই। ১৯৭১ সালে একটা স্কুলে মেজর জিয়া কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন।
আমরা অনেকগুলো অপারেশন করি এর মধ্যে নন্নী বারমারি রোডে আমবাগানের দক্ষিন পাশে ফাঁদ পেতে পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য ও অফিসারসহ গাড়ি ধ্বংস করি এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করি। এই অপারেশনটি আমরা আব্দুল গফুরের কমান্ডে করি। কামালপুর ভয়াবহ যুদ্ধে ১১নং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের একটি পা উড়ে যায়। ক্যাপটেন সালাউদ্দিন শহীদ হন। ঝিনাইগাতীর হলদিগ্রামে আক্রমণ করি সেখানে নায়েক আব্দুর রাজ্জাক শহীদ হন। আরেকটা অপারেশন করি ফুলপুর থানার অন্তর্গত কাশিগঞ্জ বাজারের পাশে একটা নদী আছে। এই নদী দিয়ে পাক বাহিনীরা পেট্রোলিং করতো। আমরা নদীর পাশে পজিশন নেই এবং তাদের পেট্রোলিং করার সময় তাদের নৌকাগুলো ধ্বংসকরি। ধ্বংস করার পর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আসার সময় আমাদের পেছনে পাকিস্তানি বাহিনীর একটা দল পিছু নেয়। আমরা দ্রুত নদীর দিকে যাই এবং নদীতে লাফ দেই। সাতার দিয়ে নদী পাড় হয়ে উপাড়ে চলে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ইউসুফ আলী, আলতাফ হোসেন, মফিজ উদ্দিন, চান মিয়া, আব্দুল খালেক সহ ৬/৭ জন শহীদ হন ১০/১২ জনের মত আহত হন। সেই সময় কাদের সিদ্দিক বাহিনী পাক বাহিনীর উপর গুলিবর্ষন করায় আমরা বাকিরা প্রানে বেচে যাই।এই যুদ্ধ আব্দুল গফুরের নেতৃত্বে হয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ আমরা আনতে পারিনি শুধু যারা আহত হয়েছিলেন তাদেরকে নিয়ে আসতে পারছি। ফিরে আসার সময় আলতাফ হোসেনের বাবা আমাকে বলে বাবা তোমরা তো ফিরে আসছো আমার আলতাফ কই? আলতাফ তো শহীদ হয়ে গেছে এই কথাটা তার বাবাকে কিভাবে বলি বুঝতে পারছিলাম না। তাই তার বাবাকে বলি আসতেছে পিছনে আছে। এরকম অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে। ১৬ ডিসেম্বরের দিন আমরা সুবেদার আব্দুল হাকিম কোম্পানিতে চলে যাই। উনি আমাদের গাইবান্ধা হয়ে ময়মনসিংহ খাকডোড় ইপিআর ক্যাম্প বর্তমানে বিজিবি তে আসি । অনেক মুক্তিযোদ্ধা বাড়িতে ফিরে তাদের মা-বাবা ভাই-বোনকে না পেয়ে অনেকেই পাগলের মত কোদাল দিয়ে পাক বাহিনীর কবর খুঁড়ে তাদের লাশে বন্দুকের গ্রেনেড মেরে জিজ্ঞাসা করেছে আমার মা কই? আমার বাবা কই? আমার ভাই কই?
মুক্তিযুদ্ধ থেকে আসার পর আমরা রক্ষীবাহিনীতে যোগদানের জন্য ঢাকা সাভারে যাই। বাছাই পর্বে যারা খাটো তাদেরকে বাদ দেয়া হচ্ছিল কিন্তু সবাই যখন বিদ্রোহ শুরু করলো আর বাদ পড়া সবাই বলতে লাগলো আমরা যুদ্ধ করেছি দেশ স্বাধীন করেছি আমাদের নিতে হবে তখন ভারতের একজন মেজর তিনতলা থেকে বললেন “খামোশ বাবারা। কয়ি আদমি ঘরমে নেহি জায়েগা তামাম আদমি কো নকড়ি দেগা। ট্রেনিং করো খানা খাও আরাম করো। ” এরপর থেকে আর মাপঝোক নাই সবাইকে ট্রেনিং করানো হলো। যারা ট্রেনিং এ টিকলো তারা রয়ে গেলো আর অনেকে ট্রেনিং এ না টিকতে পেরে পালিয়ে গেলো। এরপর ৭৫ এ শেখ মুজিব এর মৃত্যুর পরে এদেরকে আর্মির বিভিন্ন কোরে স্থানান্তরিত করা হয় । শেখ মুজিব বলেছিলেন অস্ত্র জমা না হলে লাল ঘোড়া দৌড়াবো। কেন বলেছিল? লাল ঘোড়া দৌড়ানো কি? মুক্তিযোদ্ধার কাছেও অস্ত্র আছে রাজাকারের কাছেও অস্ত্র আছে। দিনের বেলাই ডাকাতি হত। মানুষকে অস্ত্র দেখিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে নিতো। তখন বঙ্গবন্ধু আপসে বসলো এবং বলল তোমাদের কাছে যা অস্ত্র আছে জমা দাও। কেউ অস্ত্র জমা দিয়েছে আবার কেউ দেয় নাই। মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকার যারা অস্ত্র জমা দেয় নাই রক্ষী বাহিনী তাদেরকে ধরে নিয়ে টর্চার করত।হাত পা দুই বাশের চিপায় ফেলে রুটির মত ঢলা দিত মাংস সরে যেত । আর পেছনে লাঠি দিয়ে বারি দিতো। আর বলতো অস্ত্র দে অস্ত্র দে। এটাই হচ্ছে লাল ঘোড়া দৌড়ানো। শেরপুরের অনেকেই এই লাল ঘোড়া দৌড়ানো টর্চার এর শিকার হয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালী উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশাই করি।

আরো খবর

আপনার মতামত দিন