স্থগিতকৃত শেরপুর-৩ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে 

by শেরপুর কণ্ঠ ডেস্ক
5 মিনিটের পড়া

শেরপুর কন্ঠ ডেস্ক : স্থগিতকৃত শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ নানান অভিযোগ ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। 

এ আসনের শ্রীবরদী এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মোট ৪ লক্ষ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার ১২৮ টি ভোট কেন্দ্রে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ভোট দেন। 

ভোট শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম। তবে ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকা কেন্দ্রগুলোতে আদিবাসী নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো । 

কাংশা ইউনিয়নের নওকুচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে দশটায় উপস্থিত ভোটারদের মধ্যে নব্বই ভাগ ভোটার ছিল আদিবাসী নারী। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মজিবুর রহমান জানায়, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৩৩৯ জন। এখনে বেলা সাড়ে দশটার মধ্যে ভোট পড়েছে প্রায় ৭০০ ভোট। 

বেলা সাড়ে ১১ টায় বাঁকাকুড়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে দেখা গেছে একই চিত্র। উপস্থিত ভোটারদের মধ্যে আদিবাসী নারী ভোটারই সবচেয়ে বেশি। এখানে ভোটার ৪ হাজার ২৮০ ভোটের মধ্যে ভোট করেছে ১ হাজার ৩৮ ভোট। এখানে নতুন ভোটার এবং বয়:বৃদ্ধ ভোটাররাও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোট দিয়েছেন। বেলা বারোটা পর্যন্ত একই রকম দৃশ্য দেখা গেছে ঝিনাইগাতী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও ভালুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে।

এদিকে এই আসনের জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের প্রার্থী মাসুদুর রহমান সকালে ৮ টায় শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের ভোট দেন। এ সময় তিনি বলেন, প্রশাসন এবং রিটার্নিং অফিসার আমাকে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের লক্ষ্যে যে আশ্বাস দিয়েছে সেই আশ্বাস যদি রাখেন তাহলে নিরপেক্ষ ভোটের পাশাপাশি আমার বিজয় সুনিশ্চিত।

এদিকে সকাল সাড়ে আটটায় একই উপজেলার রুপারপার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ভোট দেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল। তিনি এসময় বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আমি আশ্বস্ত হয়েছি সুষ্ঠু ভোট হবে। আর সুষ্ঠু ভোট হলে আমার বিজয় সুনিশ্চিত।

এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে শ্রীবরদী উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট, জামায়াতের এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং কেন্দ্রের বাইরে বিএনপির সমর্থকদের হুমকি-ধমকি এবং মারপিটের ঘটনায় জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতা কর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

বেলা ১১ টায় শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ করে বলেন, ভোটের সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং চলছে। তিনি বলেন, রুপার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে আমার এজেন্টদেরকে বের করে দেয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন কেন্দ্রে আমার ভোটারদেরকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

এই আসনের শ্রীবরদী উপজেলাতে ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৫০ হাজার এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার ভোটার সংখ্যা এক লক্ষ ৬০ হাজার। এই দুই উপজেলায় ভোটার ব্যবধান অনেক থাকলেও প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভ্রাম্যমান আদালত এবং ম্যাজিস্ট্রেট টিম সমানভাবে দেওয়া হয়েছে। এটাই প্রমাণিত হয় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নিয়মমাফিক ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়া হয়নি।

তবে তার এই অভিযোগ মিথ্যে ও ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেন ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল এবং জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বেলা দশটার দিকে শ্রীবরদী উপজেলার খড়িয়াকাজির চর ইউনিয়নের লঙ্গরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এবং লঙ্গরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট পরে। এ সময় জাল ভোট দেওয়ার অপরাধে এক তরুণকে আটক করে উত্তম মাধ্যম দিয়ে ছেড়ে দেয় জামায়াত সমর্থকরা।

বেলা সারে ১১টায় মামদামারী দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি এবং জামায়াতের পোলিং এজেন্টের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। 

একই সময়ে শ্রীবরদী ইসলামিয়া কামিলা মাদ্রাসা কেন্দ্রে বিএনপি নেতা কর্মীরা প্রত্যেক বুথ দখল করে ভোটারদেরকে প্রকাশ্যে সিল মারতে বাধ্য করেন এবং কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দেন ও প্রকাশ্যে ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারে। এই কেন্দ্রের বাইরে বিএনপির নেতাদের হামলায় জামায়াত নেতা আমীর হামযা মিস্টার আহত হয়।

ঝিনাইগাতি উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের আয়নাপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি নেতা-কর্মীরা জাল ভোটা দিতে থাকলে তাদেরকে আটক করা হলে জামায়াতের এজেন্টদের উপর সংঘবদ্ধ হামলা চালায়। জামায়াতের এজেন্ট তাজুল ইসলামকে ব্যাপক মারধর করে মারাত্মকভাবে আহত ও জখম করে।

ঝগড়ারচর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার সময় জামায়াত প্রার্থী মাসুদুর রহমান এক বিএনপি কর্মীকে হাতেনাতে আটক করে প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে হস্তান্তর করেন। এই কেন্দ্রে ব্যাপক জাল ভোট প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শ্রীবরদী সরকারী কলেজ কেন্দ্র এবং ভেলুয়া ইউনিয়নের শিমুলচূড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি নেতারা জামায়াতের এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয় বলে ভোটকেন্দ্রে জামায়াত সমর্থকরা অভিযোগ করেন। একই অভিযোগ পাওয়া যায় শ্রীবরদী আকবরিয়া পাবলিক পাইলট ইনস্টিটিউট কেন্দ্রেও।

এছাড়া শ্রীবরদী উপজেলার শালমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, খড়িয়া কাজির চর ইউনিয়নের পোড়াগড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাণীশিমূল ইউনিয়নের টেঙ্গরপাড়া উচ্চবিদ্যালয়, শ্রীবরদী সদর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীবরদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের গড়খোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের গান্ধীগাও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও জালভোট প্রদান ও প্রকাশ্যে সিল মারা হয় বলে জামায়াতের প্রার্থী সরাসরি অভিযোগ করেন।

তবে উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি রাশেদা বেগম বাঁকাকুড়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত কোন কেন্দ্রের অনিয়মের অভিযোগ পাইনি। এ পর্যন্ত যতগুলো ভোট কেন্দ্র ঘুরেছি সবগুলোতেই অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটগ্রহণের চিত্র দেখেছি।

জামায়াতের প্রার্থীর এই অভিযোগ এর বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তাদের অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। এটা একটা রাজনৈতিক ভাষা। আমি এখন পর্যন্ত কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে মৌখিকভাবে কিছু অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দেখেছি সেগুলোর কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এদিকে বিচ্ছিন্ন এসব অভিযোগের পর বেলা তিনটায় জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের কার্যালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে, প্রচুর জাল ভোট, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে জামায়াতের এজেন্টদের জোর করে বের করে দেওয়া, বাইরে জামায়াতের নেতাদের উপর হামলা, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন ঘোষণা করেন। তিনি এ সময় বলেন, আমাদের অভিযোগ গুলোর বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট এবং রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেও কোন সূরা পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে বৈষম্য করেন।

এদিকে জমায়েতের ভোট বর্জনের বিষয়ে বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, নিশ্চিত পরাজয় জেনে জামায়াতের প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন। একই সাথে তিনি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পাঁয়তারা করছে বলে জানায়। রুবেল বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আমার বিজয় সুনিশ্চিত।

এদিকে বেলা চারটার পর ভোটগ্রহণ শেষে এবং জামায়াতের প্রার্থীর ভোট বর্জনের বিষয়ে জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কে ভোট বর্জন করল বা না করল সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে এবং এখন ভোট গণনা চলছে। ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

আরো খবর

আপনার মতামত দিন