শেরপুর কন্ঠ ডেস্ক : শত বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এবং সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে শেরপুরে শহরে ‘গ্রাম শিন্নি’ অনুষ্ঠান করা হয়েছে।
এই আয়োজনকে ঘিরে ১১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উৎসবের আমেজ বিরাজ করে শহরের শেখহাটি মহল্লার ২২০টি পরিবারের মধ্যে।
এক সময় জেলার অধিকাংশ সমাজে প্রতি বছর ফসল কাটার মাস অগ্রহায়ণে গ্রাম শিন্নি অনুষ্ঠান আয়োজিত হলেও নানা কারণে আগের মতো ব্যাপকভাবে এই আয়োজন করা হয় না।
তবে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এখনো এর আয়োজন করে চলেছেন দেশের প্রাচীনতম শেরপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শেখহাটি মহল্লার পুরানো বাসিন্দারা।
গত আড়াই দশক ধরে এই ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক সুস্বাদু শিন্নি রান্নায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওই মহল্লার বাসিন্দা নূর ইসলাম।
তিনি বলেন, “এর আগে যেমন আমার বাবা আছিল, বাবা করছে ও এলাকার অন্যান্য লোকজন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ২০-২৫ বছর ধইরা আমার আন্ডারে এইটা করাইতাছি। আমার সঙ্গে সমাজভুক্ত লোকজন সবাই সহযোগিতা করছে।”
সমাজের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সবাই মিলেমিশে থাকার জন্য এই আয়োজন করা জানিয়ে তিনি বলেন, “বাপ-দাদারা করে গেছে। আমরাও করছি। সবার মনের মধ্যে এঠা উৎসব লাগে, আনন্দ লাগে। সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া এইডাই ফূর্তি।”
আয়োজকরা জানান, দলমত নির্বিশেষে একই সমাজভুক্ত পরিবার ৩৫০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে এই গ্রাম শিন্নির আয়োজন করে। তবে যারা ধার্যকৃত চাঁদা দিতে অক্ষম তাদেরকেও এই আনন্দ উৎসবে শরিক করা হয়। একইসঙ্গে যারা একাধিক ভাগ নিতে চান তাদের জন্যও সুযোগ রাখা হয়।
এই গ্রাম শিন্নি উপলক্ষে এই সমাজভুক্ত মানুষের স্বজনরা দূরদূরান্ত থেকে শেখহাটি মহল্লায় বেড়াতে আসেন এবং আনন্দ উপভোগ করেন। শিশুরা এই অনুষ্ঠানে দেখতে এসে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।
বৃহস্পতিবার ঈদগাহ মাঠের পাশে নূর ইসলামের বাড়ি বিশাল উঠান জুড়ে উৎসবের আমেজ শিন্নি আয়োজন, রান্না এবং পরবর্তীতে শিন্নি বিতরণ এসবই করেন ওই সমাজভুক্ত মানুষেরা।
বিকাল ৪টায় চারটি চুলায় ১২টি হাড়িতে এই ‘গ্রাম শিন্নি’ রান্না শুরু হয়।
শিন্নি রান্নার প্রধান বাবুর্চি বিল্লাল হোসেন বলেন, “শেখহাটি গ্রামের সমাজ একত্র থাকার জন্য গেরাম শিন্নি করতাছি। আমি এই সমাজেরই লোক। ৩০/৩৫ বছরে ধইরা এইডা করি। প্রতি বছরই আমার মনে ফূর্তি লাগে। ১০ জন নিয়া রান্না করি।”
তিনি বলেন, “প্রতি সজপেনে দুধের লগে চাইল অইল সোয়া ৬ কেজি কইরা। চিনি অইল ১৩ কেজি, গুড় অইল ৬টা কইরা। এরপর কিচমিচ অইল আপনার ৩০ গেরাম কইরা। কাজু বাদাম অইছে আড়ইশ গেরাম, দারচিনি-এলাচা আছে সোয়াশ গেরাম কইরা। ছোলা বাদাম অইল ১০০ গেরাম কইরা। আরও আছে তেজপাতা, লংসহ অন্য মসলা।”
রান্নায় সহযোগিতাকারী হাবিবুর রহমান বলেন, “আমগর সমাজের অগ্রান মাসে প্রতিবারি আমরা একটা গেরাম শিন্নি করি। এই দুধের মধ্যে কোনো পানিটানি দেইন না। এই সব কিছু গরম মশলা দিয়া আমরা পায়েসটা পাক করি। সবাই মিল্লা আমরা এডা খাই আরকি।”
পরে রাত ১০টার দিকে রান্না শেষ হয়। এরপর শিন্নি সংগ্রহের জন্য সবাই পাত্র নিয়ে হাজির হন। পরে পরিবারের নাম ধরে ডেকে ডেকে সবার মধ্যে শিন্নি বিরতণ করা হয়। এই ঐতিহ্যবাহী শিন্নি খেয়ে সবাই প্রশংসা করেন।
স্কুল ছাত্রী শিশু জান্নাতুল মাওয়া অপসরা বলে, “আমি শেখহাটি গ্রামে গ্রাম শিন্নি দেখতে আসছি। গ্রাম শিন্নি রান্না করতে দেখিনি। তবে আগে খাইছি। এবার ইনশাল্লাহ্ দেখবো, খাবো। দেখতে খুব ভাল লাগছে গ্রাম শিন্নি।”
এলাকাবাসী সজি মিয়া বলেন, “এই গেরাম শিন্নিডা আমরা বাপ-দাদার আমল থাইকা করতাছি। ওই ইতিহাসটা আমরা ধইরা রাখছি। বছর বছর সমাজের লোকগুলা বইসা আলাপ-সালাম করবার পাইলাম।”
অনুষ্ঠানে আসা মেহমান ময়মনসিংহের ত্রিশালের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইউসুফ আলী মাস্টার বলেন, “প্রতি বছর আমার বেয়াই আমাকে দাওয়াত দেন আমি আসি। আমার ভাল লাগে।”
আয়োজনকারীদের অন্যতম সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, এই অনুষ্ঠান কতদিন ধরে হচ্ছে তা আমরা নিজেরাও বলতে পারি না। এইটা আমরা ভবিষ্যতে কত দিন করতে পারবো তাও জানি না।
“ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আমাদের নূর ইসলাম ভাইয়ের নেতৃত্বে এই গ্রাম শিন্নিটি হয়ে থাকে। আমরা শেষ হয়ে গেলে হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তারা করবে।”
