আমরা বৃক্ষ নিধন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি

3 মিনিটের পড়া

শেরপুর কন্ঠ ডেস্ক : শেরপুর জেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী অবকাশ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে একটি পরিচিত নাম। পাহাড়ি ঢাল, শাল গজারি বন, নিরিবিলি পরিবেশ, আর সবুজে ঘেরা বিস্তৃত এলাকা এই অঞ্চলকে আলাদা এক পরিচিতি দিয়েছে। এই গজনী অবকাশ কেন্দ্রের নিচের অংশে ছিল একটি বড় ছায়াঘেরা গাছ, যেটি ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট স্থানের পরিচয়ে পরিণত হয়েছিল।

স্থানীয়দের কাছে এই গাছটি শুধু একটি গাছ ছিল না, এটি ছিল একটি মিলনস্থল, একটি বিশ্রামের জায়গা, একটি পরিচিত চিহ্ন। অনেকেই জায়গাটি চিনতেন এই গাছকে ঘিরেই। পর্যটকরাও এখানে এসে বসতেন, সময় কাটাতেন, ছবি তুলতেন। ধীরে ধীরে এই গাছটি গজনী এলাকার একটি অনানুষ্ঠানিক পরিচয় হয়ে ওঠে, এমনকি অনেকের কাছে এই গাছের নামেই জায়গাটি পরিচিতি পেতে শুরু করে।

সময় যত গেছে, পর্যটকের উপস্থিতি তত বেড়েছে। গজনী অবকাশ কেন্দ্রকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে এই গাছটির গুরুত্বও বেড়েছে। ভ্রমণকারীরা এখানে এসে কিছু সময় কাটানোকে তাদের ভ্রমণের একটি অংশ হিসেবে ধরে নিতেন। গাছটির ছায়া, পরিবেশ, পাখির ডাক, আর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলিয়ে এটি ছিল এক ধরনের প্রশান্তির কেন্দ্র।

এই গাছটিতে একসময় অসংখ্য পাখির বাসা ছিল। মৌমাছির চাক ছিল, যা পুরো পরিবেশকে জীবন্ত করে রাখতো। পাখির কোলাহল, মৌমাছির গুঞ্জন, আর বাতাসের শব্দ মিলিয়ে এখানে একটি স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছিল। মানুষ যেমন এখানে এসে শান্তি পেত, তেমনি এটি ছিল বিভিন্ন প্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

পর্যটকদের বসার সুবিধা বাড়াতে গাছটির চারপাশে পাকা সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়। প্রথমে বিষয়টি সুবিধাজনক মনে হলেও, ধীরে ধীরে এর প্রভাব গাছটির ওপর পড়তে শুরু করে। গাছের শিকড় মাটির সাথে স্বাভাবিক সংযোগ হারাতে থাকে। পানি ও পুষ্টি গ্রহণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। শিকড়ের চারপাশে বাতাস চলাচল কমে যায়।

২০২৪ সালে গাছটির অবস্থার অবনতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। পাতাগুলো ঝরে যেতে শুরু করে, ডালপালা শুকিয়ে যায়, গাছটি তার স্বাভাবিক সবুজ রূপ হারাতে থাকে। ধীরে ধীরে এটি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। কেউ এটিকে কাটেনি, কোনো ঝড় এটি ভেঙে দেয়নি, তবুও এটি বাঁচেনি।

এই গাছটির মৃত্যু শুধু একটি গাছের মৃত্যু নয়। এটি একটি জীবন্ত পরিবেশের পতন। এই গাছের সাথে হারিয়ে গেছে পাখির বাসা, মৌমাছির চাক, আর একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অংশ। একটি গাছের সাথে একটি ছোট বাস্তুতন্ত্রও বিলীন হয়ে গেছে।

এই ঘটনা আমাদের একটি বড় বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। গজনীর মতো পর্যটন এলাকায় উন্নয়নের নামে অনেক সময় এমন কাজ করা হয়, যা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গাছের চারপাশে কংক্রিট ঢালাই, অপরিকল্পিত স্থাপনা, আর পরিবেশের প্রতি অবহেলা ধীরে ধীরে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শেরপুরের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল একসময় ঘন শাল গজারি বনে আচ্ছাদিত ছিল। সময়ের সাথে সাথে সেই বনভূমি কমে গেছে। বিভিন্ন কারণে গাছ কাটা, দখল, আর অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে এই অঞ্চলের পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আমরা প্রায়ই বন্যপ্রাণী ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা বলি। হাতি মানুষের এলাকায় চলে আসে, ফসল নষ্ট করে, ক্ষতি করে। কিন্তু আমরা কি কখনো নিজেদের প্রশ্ন করি, কেন এমনটা হচ্ছে। বন কমে গেলে, প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হলে, তারা বাধ্য হয় মানুষের এলাকায় আসতে।

একটি গাছকে আমরা খুব সহজভাবে দেখি। আমরা ভাবি এটি একটি সাধারণ বিষয়। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই না, একটি গাছের সাথে কতগুলো প্রাণ, কতগুলো সম্পর্ক, কতগুলো ভারসাম্য জড়িয়ে থাকে। একটি গাছ মানে একটি পরিবেশ, একটি জীবনচক্র, একটি স্থিতি।

উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তাহলে তা টেকসই নয়। আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে কাজ করি, তাহলে গাছ বাঁচিয়েও মানুষের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

এই গাছটির মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি, নাকি আমরা এমন একটি পথ খুঁজছি যেখানে প্রকৃতি এবং মানুষ একসাথে বাঁচতে পারে।

আজ একটি গাছ নেই। কাল হয়তো আরও অনেক গাছ থাকবে না। একসময় হয়তো আমরা এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছাবো, যেখানে প্রকৃতি শুধু স্মৃতিতে থাকবে।

এখনই সময় ভাবার। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আমরা কি গাছ মারছি, নাকি নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি।

আরো খবর

আপনার মতামত দিন